প্রতিবেদন

ছাগলনাইয়া স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স দুই ঘণ্টা পিছিয়ে চলা

ছাগলনাইয়া পৌর এলাকার মটুয়া গ্রাম থেকে শিশু ছেলে ফয়েজকে নিয়ে এসেছেন মা আনোয়ারা বেগম। তার জ্বর ও কাশি। সকাল সাড়ে ৮টার দিকে এলেও প্রথমে টিকিট পাননি। সাড়ে ৯টা পর্যন্ত অপেক্ষার পর টিকিট পেলেও ডাক্তারের দেখা মেলে আরো আধা ঘণ্টা পর, সকাল ১০টার দিকে। হাসপাতালের বহির্বিভাগে অপেক্ষমাণ রোগী ও স্বজনরা জানায়, এখানকার টিকিট কাউন্টার খোলা হয় ৯টা থেকে সাড়ে ৯টায় এবং ডাক্তার বসেন ১০টার পর।

সম্প্রতি ৫০ শয্যা ছাগলনাইয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে গিয়ে দেখা যায়, মেডিক্যাল অফিসার ডাঃ মোঃ সালাহউদ্দিন ভুঁইয়া, ডাঃ তারিক ফারহানা, ডাঃ রেবেকা সুলতানার কক্ষ বন্ধ। দুপুর ২টা পর্যন্ত এসব কক্ষ খোলা হয়নি। সকাল সাড়ে ১০টা থেকে ঘণ্টাখানেক রোগী দেখে আবাসিক স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডাঃ আবুল খায়ের মিয়াজী, মেডিক্যাল অফিসার ডাঃ এরশাদ উল্যাহ ও ডাঃ জাবেদ জাহাঙ্গীর একযোগে বাইরে চলে যান। এ সময় তাঁদের কক্ষের বাইরে রোগীদের ভিড় জমে যায়। তাদের বেশির ভাগই ছিল শিশু। তাঁরা ফিরে আসেন দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে। তখন হুড়মুড় করে ২৫-৩০ জন রোগী ও তাদের অভিভাবকরা ঢুকে পড়েন ডাঃ এরশাদ ও ডাঃ জাবেদের কক্ষে।

ছাগলনাইয়া পৌর এলাকার মুন্সীবাড়ির মোঃ. হানিফ এসেছিলেন তাঁর চার বছরের ছেলে ফরহাদকে নিয়ে। ডাক্তার দেখাতে পারলেও ওষুধ পাননি তিনি। হানিফ বলেন, সামান্য কৃমির ওষুধও এখানে নেই। পশ্চিম ছাগলনাইয়ার হাজেরা বেগম ও রহিমা আক্তার বলেন, এখানে ওষুধ দেয়া হয় না। বাইরে থেকে কিনতে পরামর্শ দেয়া হয়। মাদ্রাসাছাত্র আবদুল কাইয়ুম বলেন, এখন সাংবাদিকদের উপস্থিতির কারণে কিছু ওষুধ দেয়া হচ্ছে। এমনিতে ওষুধ পাওয়া কষ্টের ব্যাপার। অন্যদিকে হাসপাতালে ভর্তি কয়েকজন রোগী জানায়, এখানকার খাবারের মান ভালো নয়। যারা অবস্থাপন্ন, তারা বাড়ি থেকে খাবার নিয়ে আসে। অন্যদের বাধ্য হয়ে হাসপাতালের খাবার খেতে হয়।

ওষুধ কক্ষের দায়িত্বে থাকা স্বাস্থ্যসহকারী মোঃ ইয়াছিন অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, স্টকে ওষুধ থাকলে তা রোগীদের দেয়া হয়। বেশ কয়েকজন রোগী জানায়, স্বাস্থ্যসহকারী মোঃ ইয়াছিন রোগীদের টিকিট দেয়ার কাজেও নিয়োজিত। তিন টাকার জায়গায় তিনি চার থেকে পাঁচ টাকা পর্যন্ত নেন। প্রতিদিন বহির্বিভাগে ২০০ থেকে ২৫০ জন রোগী আসে। সেই হিসাবে তার উপরি আয় খারাপ নয়। এ ব্যাপারে ইয়াছিন বলেন, ভাংতি টাকার সংকটের ফলে অনেক সময় এটা হয়ে থাকে। সকালে ২০০ টাকার মতো ভাংতি নিয়ে বসলে তাতেও হয় না।

সম্প্রতি হাসপাতালে মোট রোগী ছিল ৪৫ জন। তিনটি ওয়ার্ডে বেশ কয়েকটি বেড রোগীর ভিজিটরদের কাছে ভাড়ায় থাকায় কয়েকজন রোগীকে মেঝেতে থাকতে হচ্ছে। চিকিৎসকরা জানান, বছরের এ সময় ভর্তি রোগী কিছুটা কম থাকে। গরমকালে পেটের পীড়াসহ নানা কারণে রোগী ভর্তি থাকে বেশি। তখন অনেকে বাধ্য হয়ে মেঝেতে চিকিৎসা নেয়।

হাসপাতাল ঘুরে দেখা যায়, ডক্টরস ডিউটি রুম ও স্যানিটারি ইনসপেক্টর রুম বন্ধ। হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ও উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডাঃ কে এম নূরুল আবসার বলেন, ৫০ শয্যার এ হাসপাতালে চিকিৎসকের আটটি পদ খালি। নার্স ও ব্রাদারেরও সংকট আছে। এ কারণে অনেক সময় প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবা দেয়া যাচ্ছে না। হাসপাতালের প্রশাসন বিভাগ সূত্র জানায়, এখানে জুনিয়র কনসালট্যান্টদের মধ্যে অর্থোপেডিক, সার্জারি, কার্ডিওলজিস্ট, মেডিসিন, জেনারেল সার্জারি, অ্যানেসথেশিয়া, নাক-কান-গলা তথা ইএনটি পদ খালি রয়েছে বহুদিন ধরে। বর্তমানে ১৬ জন ডাক্তারের মধ্যে তিনজন প্রশিক্ষণে আছেন। নার্সের ১৬টি পদের মধ্যে আছেন ৯ জন। সুইপার পাঁচজনের মধ্যে আছেন দু’জন। এর মধ্যে একজন আবার প্রেষণে ফেনীতে কর্মরত। আয়া দু’জনের মধ্যে একজন, ওয়ার্ডবয় আছেন তিন জনের একজন। নিরাপত্তা প্রহরী একজনও নেই। এ ছাড়া অফিস সহকারীর দুটি ও প্রধান সহকারীর দুটি পদও খালি।

নার্সিং সুপারভাইজার সুনীতি পাল জানান, নার্স সংকটের কারণে ১৬ জনের কাজ ৯ জনকে করতে হচ্ছে। যে কারণে যথাযথ সেবা দেয়া সম্ভব হচ্ছে না। আবাসিক স্বাস্থ্য কর্মকর্তা আবুল খায়ের মিয়াজী বলেন, লোকবল ও ডাক্তার সংকটের কারণে হাসপাতাল চালাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। যে কারণে যাঁর যেটা কাজ নয়, তাঁকে দিয়ে সেটা করাতে হচ্ছে। উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডাঃ কে এম নূরুল আবসার বলেন, শূন্য পদগুলোর ব্যাপারে একাধিকবার সংশ্লিষ্ট দপ্তরে চিঠি পাঠানো হয়েছে।

-আসাদুজ্জামান দারা, ফেনী

 
     
lbheading